শিরোনাম :
-->
English
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ ইং

প্রচ্ছদ » সাকà§�ষাৎকার !!

৭ মার্চের ভাষণ এবং সিরাজুল আলম খান

26 Apr 2018 11:03:32 PM Thursday BdST

বঙ্গবন্ধু ৬ মার্চের সকাল থেকেই ‘বিএলএফ’ ও আওয়ামী লীগের ‘হাই কমান্ড’-এর নেতৃবৃন্দের সাথে কয়েকবার বৈঠক করেন। বৈঠকের একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, আওয়ামী লীগ হাই কমান্ড ‘মুক্তির সংগ্রাম’ শব্দটি দিয়ে বক্তৃতা শেষ করার কথা বলেছে। তখন ‘বিএলএফ’ হাই কমান্ড নেতৃবৃন্দ স্পষ্টভাবেই বলেন, ‘মুক্তির সংগ্রাম’ ও ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বক্তৃতার এক লাইনে থাকতে হবে এবং সে লাইন দিয়েই বক্তৃতা শেষ করতে হবে। পরে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ ‘হাই কমান্ড’-এর কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন। ৬ তারিখ বিকেল নাগাদ ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ এভাবে বক্তৃতার লাইনটি ঘোষণা দেয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ‘হাই কমান্ড’ একমত হয়েছে বলে বঙ্গবন্ধু ‘বিএলএফ’ নেতৃবৃন্দকে জানালেন।
৬ মার্চ সন্ধ্যায় সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ওই লাইনটি ঘুরিয়ে বলতে হবেÑ অর্থাৎ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। পরে সিরাজুল আলম খানকে বঙ্গবন্ধু জানালেন যে, আওয়ামী লীগ ‘হাই কমান্ড’ ‘বিএলএফ’ হাই কমান্ডের এ প্রস্তাবে একমত আছে। সিরাজুল আলম খান ৭ মার্চের বক্তৃতার জন্য বঙ্গবন্ধুকে পয়েন্টগুলো লিখে দেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পরে বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো ‘বিএলএফ’ হাই কমান্ডকে শোনালেন, তিনি কিভাবে জনসভায় বক্তৃতা করবেন। ৬ মার্চ রাত ১২টায় ‘বিএলএফ’ হাই কমান্ড-এর সাথে বঙ্গবন্ধুর পুনরায় আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধু আবারো বক্তৃতাটি আওড়ালেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে শেষ করেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন হলো?১
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রে ড. কামাল হোসেনের বয়ানে লিপিবদ্ধ আছে যে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি (কামাল হোসেন) ৭ মার্চের বক্তৃতার একটা খসড়া ইংরেজিতে লিপিবদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছিলেন। সিরাজুল আলম খান খুব সূক্ষ্ম একটি বিষয় বঙ্গবন্ধুর কাছে আলাদাভাবে তুলে ধরেন। তা হলো : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ বলার পর জনসভা থেকে যে মুহুর্মুহু করতালি ও গর্জন উঠবে সে শব্দে ওই লাইনের শেষ অংশ ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ভালোভাবে শোনা যাবে না। সে কারণে জনতার গর্জন শেষ হওয়ার পর পুনরায় বঙ্গবন্ধু যেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উল্লেখ করেন এবং ‘জয় বাংলা’ বলে বক্তৃতা শেষ করেন।
বিষয়টি তুচ্ছ বলে মনে হলেও সে সময়ের জন্য এ লাইনটি ছিল ঐশী বাণীর মতো। এখনো ওই অসম্পাদিত (ভাষণ) বক্তৃতায় ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ দুইবার শোনা যায় এবং ঠিকই প্রথমবার জনতার জয়ধ্বনির কারণে ওই লাইনের শেষাংশটি আড়ালে পড়ে গিয়েছিল। পুনরাবৃত্তি করার কারণে বক্তৃতাটি সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রেডিও বাংলাদেশ-এর আর্কাইভে তার অসম্পাদিত বক্তৃতাটি এখনো সংরক্ষিত আছে। মধ্যরাতের এ আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে বললেন, প্রথমবার ওই ঘটনা ঘটলে তাকে যেন কোনো না কোনোভাবে মঞ্চ থেকেই মনে করিয়ে দেয়া হয়। তার সে কথার প্রসঙ্গ ধরে আ স ম আবদুর রব বঙ্গবন্ধুর জামা-পায়জামায় একটু টান দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আর এ হলো, স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘বীজমন্ত্র’ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মূল ইতিহাস।২

৭ মার্চ, ১৯৭১ তারিখের জনসভা
এই জনসভা ছিল অবিস্মরণীয়। মাঠের উপর সামরিক হেলিকপ্টার উড়ছে। জনশ্রুতি ছিল যে, হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করা হবে। এতদসত্ত্বেও জনসমাগম ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত সাবেক রমনা রেসকোর্স ময়দানে সে দিনের অবিস্মরণীয় জনসমাগম সম্পর্কে সম্প্রতি সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘৭ মার্চের জনসভার চতুর্সীমায় কোনো বাস-ট্রাক ছিল না। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছিল হেঁটে। দেশের ভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন দলমতের মানুষ এসেছিল। বামপন্থী শ্রমিক নেতা কাজী জাফর আহমদের নিয়ন্ত্রণাধীন টঙ্গী শিল্পাঞ্চল থেকে তার সংগঠনের শ্রমিকরাও টঙ্গী থেকে হেঁটে এসেছিল রেসকোর্স ময়দানে। তাদের কাউকে আওয়ামী লীগ ধরে বেঁধে টাকা দিয়ে বাসে-ট্রাকে চড়িয়ে আনেনি, টি-শার্ট, টুপি উপহার দেয়নি। কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারির প্যাকেট ছিল না। জনসভায় আসা ক্যাডারদের মিছিল থেকে কোনো তরুণীর গায়ে হাত দেয়া তো অকল্পনীয়। দীর্ঘ পথ হাঁটায় বীরত্ব ছিল না, ছিল অঙ্গীকার ও প্রত্যয়, দেশের মুক্তি।’৬

৭ মার্চের ভাষণ
এই ভাষণ নিছক বক্তৃতা নয়। মঈদুলের ভাষায় ‘অনুকরণীয় ওজস্বিয়তায় ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা।’ কোনো ব্যক্তির একক ইচ্ছার প্রতিফলনও নয়। সাড়ে সাত কোটি সংগ্রামী বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। ৭ মার্চের ভাষণ গণমানুষের উদ্বেলিত চেতনার স্ফুরণ। স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী বাঙালির অনুপ্রেরণার উৎস।
এই ভাষণের প্রস্তুতিতে বঙ্গবন্ধু ছাড়াও সিরাজুল আলম খান ও অন্য কয়েকজন ছাত্র-রাজনীতিবিদ জড়িত ছিলেন তা আগে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর মুখে উচ্চারিত ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বাক্য সংযোজনের কৃতিত্ব ‘নিউক্লিয়াস’-এর প্রাণপুরুষ সিরাজুল আলম খানের।
শেখ মুজিব সংক্ষিপ্ত ১৮ মিনিটের বক্তৃতায় জনগণের আবেগ এবং ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন Ñ ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ।’
সে দিনের বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় আধা ঘণ্টা পরে সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন। কারণ সম্পর্কে কলকাতার ১০৪ রামলাল বাজারের কর্মকার বুক স্টল থেকে প্রকাশিত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ডা: কালিদাস বৈদ্য তার ‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব’৭ বইতে উল্লেখ করেছেন : ‘সে দিন তার আধা ঘণ্টা দেরি ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ইয়াহিয়ার আশঙ্কা ছিল হয়তো শেখ মুজিব এদিন জনসভায় স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা করবেন। তা থেকে নিবৃত্ত করতে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডকে ওই দিন সকালে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে পাঠান। মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী করার ইয়াহিয়ার দেয়া আশ্বাসের বার্তা নিয়ে ফারল্যান্ড মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সঙ্গে এই হুঁশিয়ারিও দেন যে, ইয়াহিয়ার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে শেখ মুজিব যদি স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা করেন তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। শেখ মুজিব ভয়ে বা প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভে বা অন্য কারণে তিনি ফারল্যান্ডকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি ওই দিনের সভায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণা করবেন না। এই প্রতিশ্রুতির কথা ফারল্যান্ড তখনই ইয়াহিয়াকে জানিয়ে দেন। ইয়াহিয়া তা জেনে সাথে সাথে মুজিবকে ফোন করে ধন্যবাদ জানান।’ (পৃষ্ঠা : ১২৯)
ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খানকে শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেই আত্মগোপনে যাবেন। কিন্তু তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, আত্মগোপনেও যাননি। সম্ভবত সভায় যাবার আগের সংক্ষিপ্ত বোঝাপড়াই এর কারণ।’ (পৃষ্ঠা : ১৩০-১৩১)
৭ মার্চ সকালে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অবস্থানের পূর্ণ নকশা মেজর মসিহ-উদ্-দৌলার বোন প্রখ্যাত গায়িকা ফিরোজা বেগম নিজে বঙ্গবন্ধুকে হস্তান্তর করেছিলেন।৫
৭ মার্চ সকালে আরো একজন বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি হলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর সম্পাদক ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন। আলাপে ‘কাকাবাবু’ (শেখ মুজিব) ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি সভায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন না। বক্তৃতায় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদে পঞ্চম তফসিলে সংযুক্ত করেছে। সংযুক্তিটি আক্ষরিক কিনা সে সম্পর্কে অনেকে ভিন্নমত পোষণ করেন। অনেকে মনে করেন যে, যৌক্তিক কারণে শেখ মুজিব বক্তৃতার শেষে ‘জয়বাংলা’র পরে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বা ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন। এতে তার দূরদৃষ্টি, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং উচ্চমানের রাষ্ট্রনায়কত্ব প্রমাণিত হয়।
শেখ মুজিব ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন যে, সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণার প্রত্যাশা করে যারা এসেছিলেন তারা অনেকখানি নিরাশ হলেন ঠিকই, কিন্তু গণ-আন্দোলনকে তীব্রতর করার আহ্বানে শ্রোতাদের বৃহত্তর অংশের স্বাধীনতার স্পৃহা উজ্জীবিত রাখলেন, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর উদ্ধত আক্রমণ থেকে নিবৃত্ত রাখলেন সামরিক শাসকদের তার ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতার মাধ্যমে।

৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ১৮ মিনিটের ১১০৫ শব্দের ভাষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ইউনেস্কো (টঘঊঝঈঙ) এই ভাষণকে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ হিসেবে ‘মেমোরি অব দি ওয়ার্ল্ড’ স্বীকৃতি দিয়েছে।

৭ মার্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধুর একার ভাষণ নয়
‘বিএলএফ’ হাই কমান্ড (সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মনি এবং তোফায়েল আহমেদ) ও আওয়ামী লীগ হাই কমান্ড (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলী)-এর সাথে আলোচনা করেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন এবং অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ নিছক বক্তৃতা নয় এবং কোনো ব্যক্তির একক ইচ্ছার প্রতিফলনও নয়; সাড়ে সাত কোটি স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন; যা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছেÑ ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ এ বক্তৃতার নেপথ্যে যে কুশলী কর্মযজ্ঞ ছিল তা-ও এই ঐতিহাসিক বক্তৃতার অংশ। আর ভাষণটি ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত হওয়ার পর তা আর বঙ্গবন্ধুর থাকেনি, এ ভাষণ বাঙালির জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণ কারো একার নয়, এমনকি বঙ্গবন্ধুরও নয়। ৭ মার্চের ভাষণ গণমানুষের উদ্বেলিত চেতনার স্ফুরণ, স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী বাঙালির অনুপ্রেরণার উৎস। ভাষণটি স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রস্তুতি নিতে এবং সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেও সশস্ত্র যোদ্ধাদের উৎসাহিত করেছে।
৭ মার্চের ভাষণের পর্যায়কালে স্বাধীনতার বিষয়কে তুলে ধরতে বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর যে ক’জন মানুষ এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তা জেনে রাখা আবশ্যক। এ পর্যায়ের জনগণের আকাক্সক্ষাকে ছায়ারূপ দিতে ‘নিউক্লিয়াস’ নামের গোপন সংগঠন এবং তার তিন সদস্য সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদকে যথাযোগ্য স্থান দিতে হবে।
পরিশেষে যে কথাটি বলতে হয়, যখন কেউ ভাবেনি স্বাধীন বাংলার কথা, আলাদা একটি পতাকার কথা, স্বাধীন বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্রের কথা, তখন যারা ভেবেছিলেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং হাতে হাত রেখে দীপ্ত ও নির্ভীক শপথ নিয়েছিলেন বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র গড়ার, তারা আর কেউ নন ১৯৬২ সালের ছাত্রলীগের সে ‘তিনজন ছাত্রনেতা’, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদ আর তাদের গড়া গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ বা ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’! আরো স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, মূলত এ তিনজনই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা।২
মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কখনো পেছনের দিকে ধাবিত হয় না। তবে চক্রান্তে অনেকের উদ্যোগ সাধনা এক ব্যক্তির নৈবেদ্যে পরিণত হয়। জীবিত সিরাজুল আলম খান কি এখনো নীরব থাকবেন?
ফ্রিডরিখ অ্যাঙ্গেলস মার্কসবাদেরই প্রবক্তা কার্ল মার্কসকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ইতিহাসের লেখন সম্পর্কে। আর তার জবাবে মার্কস লিখেছিলেন, ‘হ্যাঁ, চাটুকার তাঁবেদাররা ইতিহাস লিখে সত্য হিসেবে নয়, প্রহসন হিসেবে।’

৭ মার্চের ভাষণে মেজর জিয়ার প্রতিক্রিয়া
এই বক্তৃতা প্রসঙ্গে মেজর জিয়াউর রহমানের বক্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য : ‘৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে তা জানালাম না।’৮

কমরেড বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বক্তৃতায় শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘জনগণকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ এটা ছিল তার দ্বারা উচ্চারিত এক মহা সত্য। কিন্তু তার সাথে তিনি যেসব কথা বলেছিলেন তার চরিত্র ছিল অন্য রকম। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বলেছিলেন, মুক্তিসংগ্রামের কথা বলেছিলেন। তার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন লাঠিসোঁটা নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার।’ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কথা ইতঃপূর্বে কেউ বলেনি। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধে কেউ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলে না। তারা বাইরে বের হয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম করে। ৭ মার্চের বক্তৃতা পরিস্থিতির চাপে শেখ মুজিবের বাগ্মিতার উত্তেজিত উচ্ছ্বাস (Oratorical exuberance) ছাড়া কিছু ছিল না। তার সাথে সম্পর্ক ছিল না দেশের ভূমি বাস্তবতার (Ground reality) । তা ছাড়া আওয়ামী লীগ ছিল উৎপাদনের সাথে সম্পর্কহীন নানা স্বার্থের প্রতিনিধি।৫
এর প্রমাণ পাওয়া গেল ৭ মার্চের পরই। ‘তারা পাকিস্তান সরকারকে অমান্য করে দেশের শাসনভার নিজেদের হাতে নিলেন। কিন্তু দেখা গেল কমিউনিস্টসহ কোনো ধরনের রাজবন্দীকে তারা জেল থেকে মুক্তি দিলেন না, যদিও জেলের পুরো নিয়ন্ত্রণ তখন তারাই করছিলেন। মণি সিংহ, দেবেন শিকদার, ইঞ্জিনিয়ার শহীদুল্লাহসহ বহুসংখ্যক নেতাকে তারা জেলেই আটক রেখেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য মুক্তি দেননি। তারা জেলে আটক ছিলেন যেভাবে পাকিস্তান সামরিক সরকার তাদেরকে আটক করেছিল অথচ তারা প্রত্যেকেই ছিলেন দেশপ্রেমিক।’
এই আক্রমণের পরবর্তী ঘটনাবলির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শ্রেণী চরিত্র ও তার চরম দুর্বলতা উন্মোচিত হয়েছিল। ২৫ মার্চের আগে মার্চ মাসের প্রথম থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ প্রবল বিক্ষোভ শুরু করেছিল।
২৫ মার্চের আক্রমণের পর শেখ মুজিবের আত্মসমর্পণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আওয়ামী লীগের সমগ্র নেতৃত্ব ও কর্মীবৃন্দ এবং তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীর দল প্রাণ রক্ষার জন্য দেশের জনগণকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম আক্রমণের মুখে ফেলে ভারতে পলায়ন করলেন। এ সম্পর্কে মার্কসবাদী নেতা চারু মজুমদার বলেছিলেন, 'These people reached India as soon as their legs carry them.'9
‘এভাবে শূন্য হাতে ভারতে উপস্থিত হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কাজ দাঁড়িয়েছিল ভারত সরকারের কাছে দেনদরবার করা এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন করার দায়িত্ব ভারত সরকারের ওপর অর্পণ করে তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করা।’
‘তবু সেই অবস্থায় হাজার হাজার কৃষক শ্রমিক মধ্যবিত্তের সন্তান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন এবং যথাযথ সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রশস্ত্রের অভাবে তারা অকাতরে নিজেদের জীবন দিয়েছিলেন। ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ তাদেরকে পাকিস্তানি কামানের খোরাক (Cannon fodder) হিসেবেই ব্যবহার করেছিল।’৯ হ

তথ্যসূত্র
১. ‘দি রিপোর্ট অব হামুদুর রহমান কমিশন : রিপোর্ট অব ইনকোয়ারি ইন টু দি ১৯৭১ ওয়ার’, ভ্যানগার্ড বুকস, পাকিস্তান। ২. আলোর মিছিল, ১-১৫ ডিসেম্বর ২০১৭। ৩. ঢাকাস্থ মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেল থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের স্টেট ডিপার্টমেন্টকে প্রেরিত টেলিগ্রাম নম্বর ৫৪০, ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১, ন্যাশনাল আর্কাইভস, সেন্ট্রাল ফাইল ১৯৭০-১৯৭৩, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ডকুমেন্ট ১২১, ভলিউম ই-৭। ৪. মঈদুল হাসান, ‘উপধারা একাত্তর : মার্চ-এপ্রিল’, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭। ৫. এ কে খন্দকার, মঈদুল হাসান ও এস আর মীর্জা, ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর : কথোপকথন’, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৯। ৬. বাঙালির জনসভার উপাখ্যান, প্রথম আলো, ১৩ মার্চ ২০১৮ ৭. ডা. কালিদাস প্রণীত ‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব’। ৮. একটি জাতির জন্ম, দৈনিক বাংলা, ২৬ মার্চ ১৯৭২ পুনঃমুদ্রিত ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’, স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা, ১৯৭৪ ৯. বদরুদ্দীন উমর, ‘ড. আহমদ শরীফ বক্তৃতা : বাঙলাদেশের রাজনীতি ও শাসন ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের উত্থান’, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
লেখক : ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র

এই সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

পাঠকের মন্তব্য (0)

সর্বশেষ সংবাদ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময়সূচী

ওয়াক্ত সময় শুরু
ফজর ০৩:৫৬
জোহর ১২:০৬
আসর ১৫:২৮
মাগরিব ১৮:৫০
এশা ২০:১৬
সূর্যোদয় ০৫:২২
সূর্যাস্ত ১৮:৫০
তারিখ ১৭ জুলাই ২০১৮